Apps

Picture

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ: কঠোর মনিটরিংয়ে ঘুষ-হয়রানি উধাও

Picture

‘ঘুষ-হয়রানি, ডিউটি অফিসারের অসংলগ্ন প্রশ্ন, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) ভীতিকর আচরণ ও নাজেহাল’- থানাগুলোর এমন চিরচেনা পরিবেশ পাল্টে যেতে শুরু করেছে। টাকা ছাড়া মামলা বা জিডি না নেয়ার ঘটনাও কমছে। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে ঢাকা রেঞ্জের ৯৬টি থানার চিরচেনা দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে গেছে।

 

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে রেঞ্জ অফিসগুলো কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। জিডি বা মামলা হওয়ার পর বাদীকে পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে ফোন করা হচ্ছে। মনিটরিংয়ে ঘুষ, হয়রানি ও নাজেহাল হওয়ার ব্যাপারে বাদীদের জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে।

মনিটরিংয়ের শুরুতে নানা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। তবে এখন সেগুলো কমে আসছে। জিডি ও মামলা করার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন ও হয়রানির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। তবে টাকার বিনিময়ে আসামি পরিবর্তন ও মনগড়া চার্জশিট দেয়ার অভিযোগ এখনও পাওয়া যাচ্ছে।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যাতে যোগাযোগ করতে না পারেন সে জন্য দু-একটি ক্ষেত্রে বাদীর ভুল মোবাইল ফোন নম্বর সরবরাহের ঘটনা ঘটেছে। আসামি গ্রেফতারে শিথিলতা ও ঘুষ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, থানাগুলোয় মাসে অসংখ্য জিডি হলেও প্রায় তিন হাজার তদন্ত উপযোগী (অ্যাকশনেবল) জিডি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি মাসে দুই হাজার ৮শ’ থেকে তিন হাজার মামলা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মামলা মাদকসংক্রান্ত। এসব মামলার বাদী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হওয়ায় রেঞ্জ অফিস বা সার্কেল এসপির অফিস থেকে তাদের ফোন দেয়া হয় না।

তবে অন্য মামলাগুলোর বাদীকে ফোন দেয়া হয়। জিডি বা মামলা করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট থানা থেকে এর কপি ঢাকা রেঞ্জ অফিসে চলে যায়। রেঞ্জ অফিস থেকে থানাগুলোয় পাঠানো ফরম্যাট অনুযায়ী জিডি নেয়া হচ্ছে। অবশ্য কেউ চাইলে সাদা কাগজে লিখেও জিডি বা মামলা করতে পারেন।

যুগান্তরের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ঢাকা রেঞ্জের বিভিন্ন থানায় ৩ মাসে হওয়া মামলা ও জিডির অর্ধশতাধিক বাদীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।

১২ জানুয়ারি ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ৮৬০ নম্বর জিডির বাদী জাহাঙ্গীর খান যুগান্তরকে বলেন, নিখোঁজের জিডি করতে থানায় গিয়ে আমি পুলিশের আচরণে মুগ্ধ হয়েছি। এজন্য পুলিশ কোনো টাকা দাবি করেনি।

৩১ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ১৪৫০ নম্বর জিডির বাদী হযরত আলী বলেন, জিডি করার পরদিন ঢাকা রেঞ্জ অফিস থেকে আমাকে ফোন করা হয়। পুলিশের তৎপরতায় দ্রুত নিখোঁজ ভাগনেকে ফিরে পেয়েছি। পুলিশের ভূমিকা ছিল খুবই ইতিবাচক।

৩ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর থানার ১৩৬ নম্বর জিডির বাদী গার্মেন্ট কারখানার অ্যাডমিন ম্যানেজার পরিতোষ চন্দ্র দাস বলেন, কারখানার প্ল্যানিং ম্যানেজার তৌহিদুল ইসলাম চাকরি ছেড়ে দেয়ার পর তার বেতন হতে দেরি হচ্ছিল। এ কারণে তিনি আমাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিলেন। বিনা পয়সায় পুলিশ জিডি নেয় এবং জিডির পরদিনই পুলিশ ঘটনা তদন্ত করে। এরপর তৌহিদুল আর হুমকি দেননি।

একইদিন কালিয়াকৈর থানার জিডির বাদী রেশমা আক্তার রুনা বলেন, যৌতুক নিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে জিডি করতে গেলে পুলিশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাকে সহায়তা করে। অর্থ ছাড়াই পুলিশ আমার সমস্যা সমাধান করে দিয়েছে।

২৭ নভেম্বর ফরিদপুরের মধুখালী থানায় দুটি জিডি হয়েছিল। ১১৭৪ নম্বর জিডির বাদী রফিকুল ইসলাম আর ১১৭৮ নম্বর জিডির বাদী মির্জা বাবু। কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি। কারণ, থানা থেকে তাদের ভুল মোবাইল ফোন নম্বর দেয়া হয়েছিল।

২৭ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানায় সোনালী ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন জিডি করেন। তিনি বলেন, জিডি করতে গিয়ে থানা পুলিশের সম্পর্কে তার ধারণা পাল্টে গেছে। নেতিবাচক ধারণা থাকায় এক পরিচিত সাংবাদিককে নিয়ে থানায় জিডি করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু থানায় যাওয়ার পর আমার ধারণা পাল্টে যায়। হয়রানি ছাড়াই পুলিশ জিডি নেয়। একই থানার জিডি বাদী রকিবুল ইসলাম বলেন, জিডির পর পুলিশের তৎপরতায় দ্রুত মোবাইল ফোন সেট ফেরত পেয়েছি।

২১ জানুয়ারি করা মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার ২০ নম্বর মামলার বাদী শামছুল ইসলাম বলেন, আমার ভাই ল্যান্স নায়েক আবুল হোসেনের ওপর স্থানীয় রমিজ ও তার সহযোগীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এতে তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পান। বেশ কয়েকদিন তিনি সিএমএইচের আইসিইউতে ছিলেন। এ ঘটনায় কোনো ধরনের হয়রানি ও টাকা ছাড়াই পুলিশ মামলা নেয়। তবে এখনও কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। উল্টো আসামিরা মামলা তুলে নিতে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। হত্যার হুমকিও দিচ্ছে।

২৩ জানুয়ারি একই থানায় করা মামলার বাদী শহিদুল চোকদার বলেন, হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করা হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। তিনি জানান, আসামি শাহীন বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছে এমন খবর পুলিশকে জানানো হলে পুলিশ জানায়, এজাহারে শাহীনের নাম নেই। পরে এজাহার দেখে জানা যায়, এজাহার থেকে শাহীনের নাম কেটে দিয়ে পুলিশ নুরুল ইসলাম নামে আরেকজনকে আসামি করেছে। অথচ নুরুলকে আমি চিনি না।

২ নভেম্বর দোহার থানায় করা ১ নম্বর মামলার বাদী সামাদ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। কারণ, থানা থেকে বাদীর ভুল মোবাইল ফোন নম্বর দেয়া হয়েছে।

৪ নভেম্বর একই থানায় করা ৪ নম্বর মামলার বাদী বাদশা খান বলেন, প্রতারণার মাধ্যমে ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে মামলা করেছি। মামলার সময় পুলিশ কোনো টাকা না নিলেও আসামি ধরার জন্য মাঝেমধ্যে তার কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিচ্ছে।

২৬ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় করা অপহরণ মামলার বাদী সুলাইমান বলেন, অপহরণের ১৬ দিন পর পুলিশের সহযোগিতায় অপহৃত ভাগনিকে উদ্ধার করা হয়। ওইদিন গাড়ি ভাড়াবাবদ পুলিশকে আড়াই হাজার টাকা দিয়েছি। এর বাইরে পুলিশ কোনো টাকা দাবি করেনি। ২৬ জানুয়ারি একই থানায় করা ৬৫ নম্বর মামলার বাদীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। কারণ, তার মোবাইল ফোন নম্বরের একটি ডিজিট কম ছিল।

জানতে চাইলে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি আসাদুজ্জামান বলেন, মামলা বা জিডির একজন বাদীকে কমপক্ষে দু’বার ফোন দেয়া হয়। জিজ্ঞাসা করা হয়- থানায় যাওয়ার পর পুলিশের আচরণ কেমন ছিল? সেন্ট্রি, ডিউটি অফিসার এবং ওসির রুমসহ কোনো পর্যায়ে তিনি কোনো হয়রানির শিকার হয়েছেন কি না। কোনো পুলিশ সদস্য টাকা চেয়েছেন বা নিয়েছেন কি না। জিডির তদন্ত হয়েছে কি না, তা-ও জানতে চাওয়া হয়। মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে বাদীকে ফোন দিয়ে জানতে চাওয়া হয়, আসামি ধরার ক্ষেত্রে কোনো টাকা দিতে হয়েছে কি না।

অতিরিক্ত ডিআইজি আসাদুজ্জামান আরও বলেন, প্রথমদিকে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ বেশি ছিল। অর্থ লেনদেনের অভিযোগও ছিল। জিডি বা মামলা করার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন অনেক কমে এসেছে। এখন এক থেকে দুই শতাংশ (পার্সেন্ট) থাকতে পারে। তদন্তের ক্ষেত্রে যেসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগ ছিল- মামলা ও জিডি করতে পুলিশ টাকা নেয়। থানায় গেলে পুলিশ খারাপ ব্যবহার করে। এসব অভিযোগ থেকে পুলিশকে মুক্ত করতে উচ্চপর্যায় থেকে অনেক চিন্তাভাবনা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সফলতা আসেনি।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমানের সিদ্ধান্তে সফলতা আসতে শুরু করেছে। জিডি ও মামলার বাদীদের রেঞ্জ অফিস থেকে সরাসরি ফোন করার সিদ্ধান্ত নেন ডিআইজি হাবিবুর। বিষয়টি কার্যকর হওয়ায় ডিএমপিসহ পুলিশের অন্যসব ইউনিটও এ কৌশল গ্রহণ করেছে।

 
Copyright © 2022 Superintendent of police, Shariatpur. Developed by Momtaj Trading(Pvt.) Ltd.